গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা: প্রথম ৩ মাসে যা খাবেন

আপনি যখন মা হতে যাচ্ছেন, তখন আপনার খাবার শিশুর বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং শক্তি সরবরাহ করছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাই গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা জানা অতীব জরুরী। কারণ, গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে যে পরিবর্তনগুলো আসে তা মোকাবেলার জন্য তার শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা আজ এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনাকে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকা সম্পর্কে জানাবো। স্বাস্থ্যকর গর্ভের জন্য একজন হুবু মায়ের সুষম এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। কারণ এতে প্রোটিন, শর্করা এবং চর্বিযুক্ত খাবারের সঠিক ভারসাম্য থাকে।

গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকা

অনেকেই বলে থাকে গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি খাওয়া উচিত। কিন্তু এ কথাটির বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। বেশি নয়, এসময় বরং পরিমাণ মত খাওয়া উচিত। অর্থাৎ যতটুকু খাবার আপনার জন্য যথেষ্ট, তাই গ্রহণ করা উচিত।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার আপনার ওজন বাড়িয়ে দেয়। পরে এরই জন্য অনেক ক্ষতি হয় মা এবং বাচ্চার। তাই গর্ভাবস্থায় খাবারের পরিমাণ গ্রহণে সচেষ্ট হোন। নিচে দেয়া খাবারের তালিকাটি দেখুন আর পরিমাণ মত গ্রহণ করুন।

১. দুগ্ধজাত খাবার

বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী নারীদের খাবারের তালিকায় দুগ্ধজাত খাবারগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কারণ এ ধরনের খাবারে রয়েছে ক্যালসিয়াম যা আপনার ডায়েটের জন্য প্রয়োজনীয় গর্ভাবস্থায় আপনার পরিমাণ অনুযায়ী দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া উচিত। এটি আপনার ভেতরে থাকা মানুষটির হাড় এবং দাঁতের পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করে।

তাই এ সময় স্বল্প ফ্যাটযুক্ত দুধ, পনির এবং দই আপনার প্রতিদিনের খাবারে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করুন। তবে মনে রাখা জরুরি যে, দুগ্ধজাত এসব খাবারের পরিমাণ যেন প্রয়োজনের অধিক না হয়।

২. খনিজ সমৃদ্ধ খাবার

গর্ভবতী মায়েদের জন্য ক্যালসিয়াম এবং আয়রন জাতীয় খনিজ সমৃদ্ধ খাবারগুলো অতীব জরুরী। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত শক্ত রাখে। আর এ জন্য আমাদের শরীরে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের দরকার হয়।

অপরদিকে গর্ভবতী মায়েদের দেহে আয়রনের ঘাটতি হলে কোষেরা যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না। ফলে শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া আয়রনের অভাবে রক্তাল্পতাও হয়ে থাকে। আমাদের শরীরে প্রতিদিন ১০ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন হয় । বিভিন্ন প্রকার খনিজ সমৃদ্ধ খাবারগুলোর তালিকা নিচে দেয়া হলো।

  • ক্যালসিয়াম: সবুজ শাকসব্জী, আঙুর, দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম, বিটরুট, মাছ ও তিল।
  • আয়রন: সয়াবিন, খেজুর, বেদানা, শুকনো ফল, আম ও ডিম।
  • আয়োডিন: আয়োডিনযুক্ত লবণ, পনির, সীফুড।
  • ম্যাগনেসিয়াম: সব ধরণের মটরশুটি, কাজু বাদাম, ব্রকলি, তোফু।
  • ফসফরাস: মাছ ও মাংস।

৩. শাকসবজি

আপনি যখন নিয়মিত শাকসবজি খাবেন, আপনার শরীরে অনেকগুলো সুবিধা সরবরাহ করবে। শাকসবজিতে ফ্যাট, ক্যালোরি এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম থাকে। তাছাড়া এগুলো ফাইবারের ভাল উৎস যা গর্ভবতীদের কোষ্ঠকাঠিন্য মোকাবেলায এবং প্রতিরোধে সাহায্য করে।

সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে ফোলেটসহ অন্যান্য ভিটামিন এবং খনিজ যা ভ্রূণের বিকাশের সময় নিউরাল টিউব ত্রুটি এবং স্পিনা বিফিডার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। তাই এ সময় গাজর, মিষ্টি আলু, কুমড়ো, পালং শাক এবং অন্যান্য রান্না করা শাক খান। পাশাপাশি টমেটো এবং লাল মিষ্টি মরিচ যা ভিটামিন এ এবং পটাসিয়ামে সমৃদ্ধ, গ্রহণ করুন।

শাকসবজি স্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। তাই এটি খাওয়ার জন্য বিশেষ কোন প্রয়োজনের দরকার পরে না। যে কেউ শাকসবজি খেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা কাঁচা শাকসবজি যেমন গাজর, শশা এবং টমেটো ইত্যাদি খাওয়ার ক্ষেত্রে জোর দিয়ে থাকেন। খাওয়ার আগে কোনও শাকসবজি ভাল করে ধুয়ে নিন যাতে করে আপনি গর্ভাবস্থায় কোন জীবাণুতে সংক্রমতি না হন।

৪. আমিষ জাতীয় খাবার

প্রতিদিনের খাবারে অন্তত একবার হলেও আপনার আমিষ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত। আমিষ জাতীয় খাবারগুলো কার্যকরভাবে আপনার শিশুর বিকাশকে সাহায্য করে এবং একই সাথে আপনার দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে। এটি শিশুর স্বাস্থ্যকর মস্তিষ্ক এবং হার্টের স্বাভাবিক গঠনে সহায়তা করে।

বিশুদ্ধ আমিষের জন্য মাছ, মুরগির মাংশ এবং অন্যান্য চর্বিহীন মাংস গ্রহণ করুন। এছাড়াও ডিম, বাদাম, ডাল এবং শিম আমিষের অন্যতম উৎস।

৫. ফলমূল

অনেকেই গর্ভাবস্থায় ফল খাওয়ার বিরুদ্ধচারণ করে থাকেন। কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে ভুল একটি সিদ্ধান্ত। ফল শুধু সুস্বাদুই নয়; এটি আপনার শরীরের ক্ষতিকর চিনির প্রভাব রোধ এবং আগত শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। তাই বলা চলে, ফল গর্ভাবস্থার ডায়েটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

তবে ফল খাওয়ার আগে আপনাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ব্যাকটিরিয়া থাকতে পারে এমন ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। পাশাপাশি অন্যান্য দ্রব্য কাটার জন্য ব্যবহৃত ছুড়ি দিয়ে কখনোই ফল কাটা উচিত নয়। প্রয়োজনবোধ ফল এবং ছুরি উভয়ই বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। কারণ ব্যাকটিরিয়া ফলের খোসার উপর পাওয়া যায় যা আপনার বাচ্চার পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কি কি ফল খেতে পারেন?

  1. কলা
  2. ডালিম
  3. আম
  4. স্ট্রবেরি
  5. সাইট্রাস ফল
  6. আপেল
  7. নাশপাতি
  8. আঙ্গুর

৬. ভোজ্য তেল

গর্ভাবস্থায় অনেকগুলো খাদ্য বিধিনিষেধের মধ্যে তেল এবং চর্বি শীর্ষে রয়েছে। অনেকেই এগুলো থেকে বিরত থাকতে বলেন। কিন্তু পুষ্টিবিদরা এগুলি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন না। কারণ তেল আপনার শিশুর মস্তিষ্ক এবং চোখের বিকাশের জন্য উপকারী। তবে আপনার তেল গ্রহণ প্রতিদিন ছয় চা-চামচের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।

৭. পানি

পানি যেকোন মানুষের শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। পানি বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সমাধান করে এবং গর্ভাবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই যতটা সম্ভব, প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করুন। গর্ভাবস্থার বিভিন্ন লক্ষণগুল যেমন সকালে অসুস্থতা এবং বমি বমি ভাব দূর করতে পানি আপনাকে সহায়তা করতে পারে।

তবে শুধু পানিই না, বিভিন্ন প্রকার কোমল পানীয় যেমন: স্যালাইন, জুস, গ্লুকোজ এবং ফলের রসও খেতে পারেন। তবে এ সকল পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনি খুব বেশি পরিমাণে চিনি গ্রহণ করছেন না।

গর্ভাবস্থায় এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন

  • ধোয়া নয় বা জীবাণুমুক্ত নয়, এমন ফল এড়িয়ে চলুন। বাজারে বিক্রি হওয়া ফলে বিভিন্ন কীটনাশক দেয়া থাকে। তাই অবশ্যই এগুলো ধুয়ে ফেলতে হবে যাতে করে ভ্রূণের পক্ষে ক্ষতিকারক না হয়।
  • পূর্বে থেকেই প্যাকেটজাত করা খাবারগুলোর সতেজতা অনিশ্চিত। তাই গর্ভাবস্থায় এ ধরনের খাবার যথা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
  • কিছু সামুদ্রিক খাবারে মিথাইল পারদ থাকে যা ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য বিপজ্জনক। এছাড়াও মাংস যদি এটি সঠিকভাবে রান্না না করেই খাওয়া হয় তাহলে এর দ্বারা ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • যে কোনও উপায়ে কোনও ধরণের অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। কারণ এটি আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। শুধু গর্ভাবস্থায়ই না, শিশুর জন্মের পরেও স্তন্যপান করানোর সময় অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহলের মতো অনিরাপদ খাবারগুলি স্তনের দুধের মাধ্যমে শিশুর কাছে যেতে পারে।

►► আরো দেখো: জন্মের প্রথম ঘণ্টা থেকেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো
►► আরো দেখো: সিজারের পরে সহবাস কিভাবে করবেন? ভুল করছেন না তো?


শেষ কথা

গর্ভধারণের কেবল ১০ মাসই নয়, মাতৃত্বের গোটা পথটাই বড্ড চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। মা তো কেবল নিছকই একটা ডাক বা অনুভূতি নয়! এ এক বিশাল দায়িত্ব। তাই শুরুটা শুরু করুন স্বাস্থ্যকর উপায়ে। গর্ভাবস্থার এই সময়টা শুধুমাত্র শারীরিকভাবেই না, মানসিক দিক থেকেও এগিয়ে থাকার চেষ্টা করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *