গর্ভবতী মায়ের সতর্কতা

গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা

গর্ভধারণ প্রতিটি নারীর জীবনের একটি সুন্দর সময়। কিন্তু এই সময়টিতে পর্যাপ্ত সতর্ক হওয়া একটি সুস্থ্য নবজাতকের জন্মদানে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা আপনাকে দারুণ একটি ফলাফল এনে দিতে সক্ষম। গর্ভধারণের মধ্য দিয়ে আপনি মাতৃত্বের এগিয়ে যাচ্ছেন। তাই আপনার আনন্দের সেই চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসার আগ পর্যন্ত মা হিসাবে আপনাকে অনেক কিছু মেনে চলতে হবে।

আপনি মা হতে যাচ্ছেন, এটি শোনার পর থেকেই আপনার কিছুটা উদ্বেগ বোধ তৈরি হতে পারে। যদি এটিই আপনার প্রথম সন্তান হয়ে থাকে, তবে আপনি অনেক বিষয় সম্পর্কেই অজ্ঞ থাকবেন। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। রিমেডিস্টে আজ আমরা আপনাকে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা সম্পর্কে অবগত করব।

এর ফলে আপনি জানতে পারবেন গর্ভধারণের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে আপনি কি করতে পারবেন? কি করতে পারবেন না? আবার কোন ধরনের খাদ্যগুলো আপনার গ্রহণ করা উচিত, কোনগুলো বর্জন করা উচিত। আমরা আপনার প্রথম ত্রৈমাসিকের জন্য এই তালিকাটি তৈরি করেছি। যাতে আপনি গর্ভাবস্থার এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আপনার এবং আপনার সন্তানের পক্ষে সেরা এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারেন।

গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা

গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোর মধ্যে একটি। এই প্রথম তিন মাসে অনেক কিছুই ঘটে। এই সময়টিতে আপনার শিশুর অন্য সময়ের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি হয়। ছয় সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত একটি হার্টবিট শোনা যায় এবং ১২ সপ্তাহের শেষে আপনার শিশুর হাড়, পেশী এবং দেহের সমস্ত অঙ্গ গঠিত হয়।

তবে গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে আপনার সন্তান একটি ক্ষুদ্র আকৃতি থেকে তার যাত্রা শুরু করে। যা আমরা ভ্রূণ বলে জানি। একটি ক্ষুদ্র ভ্রুণ থেকে আপনার সন্তানকে বাস্তবে রূপ দিতে আপনাকে অনেক কিছুর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। চলুন, তাহলে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা সম্পর্কে জানি।

মর্নিং সিকনেসের জন্য প্রস্তুতি নিন

গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে Morning Sickness বা সকালের অসুস্থ্যতা তৈরি হয়। যদিও এটি মর্নিং সিকনেস নামেই পরিচিত। তবে প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় পুরো দিন ধরেই এ অসুস্থ্যতা থাকতে পারে। যদিও সবাই গর্ভাবস্থায় সকালের অসুস্থতায় ভোগেন না।

এ সময়ে গর্ভবতী নারীদের বমি বমি ভাব হয় এবং এটি প্রতিরোধের জন্য বিশেষ ধরনের চা তৈরি করা হয়। যদি আপনিও মর্নিং সিকনেসের সম্মুখিন হয়ে থাকেন, তবে প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা পান করতে পারেন।

স্ট্রেস দূরে রাখুন

এই সময়টিতে আপনাকে মানসিকভাবে দৃঢ়, সুস্থ্য এবং শক্ত থাকতে হবে। কারণ স্ট্রেস আপনার স্বাস্থ্যের জন্য এবং শিশুর বিকাশের পক্ষে খারাপ। আর তাই আপনি যতটা সম্ভব মানসিক চাপ এড়িয়ে চলবেন। এটি করার জন্য আপনার হাতের কাজগুলো ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে সম্পন্ন করুন। একবারে সমস্ত কাজ করার পরিবর্তে ধীরে ধীরে করুন।

চাপ কমাতে আপনি মেডিটেশন করতে পারেন। এ জন্য গভীর শ্বাসের অনুশীলন করুন। আপনি যখন চাপ অনুভব করতে শুরু করবেন তখন নিজেকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে দেবেন না। গর্ভাবস্থার সকল কাজ সম্পন্ন করার আগে পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। এটি আপনাকে সংগঠিত রাখতে এবং আপনার যা করতে হবে তা সুসম্পন্ন করতে সহায়তা করবে যাতে আপনি চাপ কমাতে পারেন।

অভ্যাস পরিবর্তন করুন

আপনি হয়তো এ সময়টিতে আইসক্রিম এবং আচার খাওয়ার ইচ্ছে করবেন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্বাস্থ্যকর সকল খাদ্যের দিকে মনোনিবেশ করুন। গর্ভাবস্থায় আপনার প্রচুর প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন হবে। তাই ফল, বাদাম, শাক শাকসবজির পাশাপাশি কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারগুলো গ্রহণ করুন। অন্যদিকে চিপস, অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় এবং জাঙ্ক কিংবা ফাস্টফুড পরিহার করুন।

পশ্চিমা সংস্কৃতির মত আমাদের দেশেও অনেক নারীকে সিগারেট বা মদ জাতীয় পানীয় গ্রহণ করতে দেখা যায়। এসব ক্ষতিকারক দ্রব্য আপনার জন্ম না নেয়া বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। তাই যথা সম্ভব ধুমপানসহ অন্যান্য বাজে অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।

যে সব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে:

  • অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়
  • প্যাকেটজাতকরণ খাবার
  • খুব বেশি পরিমাণে চা বা কফি
  • ক্যাফিন
  • ধোয়া নয় এমন ফলমূল
  • ধুমপান

প্রাকৃতিক এবং বাড়িতে তৈরি খাবার বেশি খাওয়ার চেষ্টা করুন। কারণ এ ধরনের খাবার খনিজ, প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং প্রোটিনে সমৃদ্ধ। আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ফোলেট সমৃদ্ধ বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যকর খাবারও গ্রহণ করতে পারেন।

প্রয়োজনী ভ্যাকসিন নিন

Flu, Tetanus, Diphtheria এবং Hepatitis B সহ অতি গুরুত্বপূর্ণ আরো ৫ টি টিকা রয়েছে যা একজন নারীর গর্ভাবস্থায় নেয় জরুরী। পাশাপাশি কোন টিকা দেয়ার প্রয়োজন পরলে অথবা হাম রুবেলা বা জলবসন্তের বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রয়োজন পরলে আপনার চিকিৎসককে দেখান। এসব রোগের বিরুদ্ধে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য আপনার কিছু পরীক্ষা করার পরিকল্পনা আগে থেকেই ভেবে রাখুন।

গর্ভাবস্থায় ৩ মাস চলাকালীন সময়ে আপনার পারটোসিস টিকা নেয়া উচিত। আপনার সঙ্গী, বাচ্চার দাদা-দাদী/ নানা-নানী এবং বাচ্চার অন্যান্য নিয়মিত সেবাদানকারীকে বাচ্চা জন্ম হওয়ার পূর্বেই পারটোসিস (হুপিং কাশি) এর প্রতিরোধমূলক টিকা নেয়া উচিত। আপনার অন্যান্য বাচ্চাদেরও হুপিং কাশির টিকা নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে নবজাতকের প্রতি অন্যদের থেকে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে না।

আপনার যে সকল ভ্যাকসিন নেয়া উচিত:

  • Flu vaccine
  • Tdap vaccine
  • Whooping cough
  • Chickenpox (varicella) vaccine
  • Measles, mumps and rubella (MMR) vaccine
  • Shingles vaccine

হাটাচলা করুন

গর্ভাবস্থায় হাটাচলা করা আপনাকে আরো বেশি সক্রিয় করে তুলবে। হাটা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সেরা অনুশীলন হিসাবে বিবেচিত হয়। এটি আপনার পেশীগুলো টোনড রাখতে সহায়তা করে এবং আপনাকে সক্রিয় রাখে। হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস করে।

তবে অতিরিক্ত হাটার ক্ষেত্রেও আপনাকে সতর্ক হতে হবে। আপনি অবশ্যই একটানা বিশ মিনিটের অধিক সময় হাটতে যাবেন না। হাটার সময় খুব বেশি গতি না দিয়ে বরং স্বাভাবিক গতি বজায় রাখুন। হাটতে হাটতে হাপিয়ে গেলে কিছুটা সময়ের জন্য বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করুন।

নারীদের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়টিতে হাটার পাশাপাশি শরীরচর্চাও জরুরি। গবেষণা বলছে যে, গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসে বিভিন্ন শারীরিক এবং হরমোনগত পরিবর্তন ঘটায়। তাই যথাযাথ অনুশীলনের মাধ্যমে একজন নারী তার হরমোনগত পরিবর্তনগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং এন্ডোরফিনের উৎপাদন বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আরো যে সব কাজ থেকে বিরত থাকবেন

  • প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার বিশেষ করে ক্যানড খাবারগুলো গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
  • ধোয়া নয় এমন ফলমুল বা শাকসবজি খাবেন না।
  • অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল এড়িয়ে চলুন।
  • কোন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্যাদির কাছে যাবেন না। এর গন্ধ আপনার বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে।
  • তৃতীয় মাসের পরে সহবাস সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলুন।

►► আরো দেখো: জন্মের প্রথম ঘণ্টা থেকেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো
►► আরো দেখো: সিজারের পরে সহবাস কিভাবে করবেন? ভুল করছেন না তো?


শেষ কথা

গর্ভধারণের কেবল তিন মাসই নয়, মাতৃত্বের গোটা পথটাই অনেক চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। মাতৃত্ব পৃথিবীর সেরা অনুভূতিগুলোর একটি। তাই গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রিয় সন্তানটির পৃথিবীতে আসা পর্যন্ত একজন মা হিসেবে আপনার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তাই শুরুটা শুরু করুন স্বাস্থ্যকর উপায়ে। গর্ভাবস্থার এই সময়টা শুধুমাত্র শারীরিকভাবেই না, মানসিক দিক থেকেও এগিয়ে থাকার চেষ্টা করুন।
Image by Regina Petkovic from Pixabay

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *