গর্ভবতী হওয়ার আগে করণীয় ও সাবধানতা

আপনি কি একটি শিশুর জন্য চেষ্টা করছেন? গর্ভবতী হওয়ার আগে করণীয় অনেক কিছু আছে যা আপনার গর্ভাবস্থার আগে, সময় এবং পরে সুস্থ থাকার বিভিন্ন দিকের সাথে জড়িত। নিজে সুস্থ্য থাকা এবং একটি পরিপূর্ণ সুস্থ্য নবজাতকের জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে একজন গর্ভবতী মায়ের অনেক বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়।

গর্ভবতী হওয়ার আগে খাবার এবং অন্যান্য যত্নের কথা আপনি ইন্টারনেট বা বই ঘেটে বের করতে পারবেন। যা আপনার গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তানের জন্মদান পর্যন্ত সাহায্য করবে। আজ রেমিডিস্টেও আমরা এমন কিছু টিপস শেয়ার করবো, যা আপনার গর্ভবতী হওয়ার আগে আপনার জন্য জানা জরুরি। তাহলে চলুন, শুরু করি।

গর্ভবতী হওয়ার আগে করণীয়

স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন

যদি আপনার কোন স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তাহলে আপনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ কোন চিকিৎসককে দেখান। নারীদের কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা গর্ভধারণের কারণে প্রভাবিত হতে পারে। যেমন বহুমূত্ররোগ, বিষন্নতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং খিঁচুনী।
যে সকল ঔষধ আপনি গ্রহণ করছেন তা বাচ্চার বিকাশে প্রভাবিত করে কিনা তাও জেনে নিতে হবে।

আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা না করে কোন ঔষধ গ্রহণ বা বন্ধ করা উচিত নয়। গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩৬ সপ্তাহে নূন্যতম প্রতি মাসে একবার এবং ৩৬ সপ্তাহের পর প্রতি সপ্তাহে একবার করে মাকে স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার দেখানো উচিত।

টিকা নিন

Flu, Tetanus, Diphtheria এবং Hepatitis B সহ অতি গুরুত্বপূর্ণ আরো ৫ টি টিকা রয়েছে যা একজন নারীর গর্ভাবস্থায় নেয় জরুরী। পাশাপাশি কোন টিকা দেয়ার প্রয়োজন পরলে অথবা হাম রুবেলা বা জলবসন্তের বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রয়োজন পরলে আপনার চিকিৎসককে দেখান। এসব রোগের বিরুদ্ধে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য আপনার কিছু পরীক্ষা করার পরিকল্পনা আগে থেকেই ভেবে রাখুন।

কারণ উল্লেখিত এসব টিকা নেয়ার অন্তত ২৮ দিন পর্যন্ত আপনার গর্ভধারণ এড়িয়ে যাওয়া উচিত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, যে সকল মহিলা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন তাদের ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিতে হবে। এই টিকা গর্ভধারণের যে কোন সময়ই নিরাপদে নেয়া যায়।

গর্ভাবস্থায় ৩ মাস চলাকালীন সময়ে আপনার পারটোসিস টিকা নেয়া উচিত। আপনার সঙ্গী, বাচ্চার দাদা-দাদী/ নানা-নানী এবং বাচ্চার অন্যান্য নিয়মিত সেবাদানকারীকে বাচ্চা জন্ম হওয়ার পূর্বেই পারটোসিস (হুপিং কাশি) এর প্রতিরোধমূলক টিকা নেয়া উচিত। আপনার অন্যান্য বাচ্চাদেরও হুপিং কাশির টিকা নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে নবজাতকের প্রতি অন্যদের থেকে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে না।

দাঁত পরীক্ষা করুন

যখন দাঁতের উপর প্লাক বা ফলক তৈরী হয় এবং আপনার মাড়িতে জ্বালা করে, তখন মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গর্ভধারণের সময় হরমোনজনিত পরিবর্তন আপনার মাড়িকে সহজেই জ্বালাতন এবং প্রদাহ করতে পারে।

তাই আপনার দাঁত সর্বদা পরিস্কার রাখুন, বিশেষ করে মাড়ির কাছে। নাটকীয়ভাবে এটি গর্ভধারণের সময় মাড়ির রোগ প্রতিরোধ করবে অথবা কমিয়ে দিবে। দাঁতের সমস্যা অতিরিক্ত বেশি হলে অভিজ্ঞ কোন ডেন্টিস্টকে জানাতে ভুলবেন না।

ফলিক এসিড গ্রহণ করুন

ফলিক এসিড vitamin B₉ এর কৃত্রিম রূপ যা Folate নামেও পরিচিত। শরীরের প্রত্যেকটি কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং গঠনের জন্য এ ভিটামিন প্রয়োজন। এটি আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে যা শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে।

আপনার গর্ভধারণের অন্তত একমাস পূর্ব থেকে ফলিক এসিড গ্রহণ শুরু করুন। সাধারণ ডোজ হচ্ছে দৈনিক ০.৫ মিগ্রা। তাছাড়া কিছু মহিলাকে তাদের চিকিৎসক আরো বেশী ডোজ নেয়ার উপদেশ দিয়ে থাকেন।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

খুব বেশি পাতলা হওয়া আবার খুব বেশি মোটা হওয়া উভয় একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত পাতলা হওয়া আপনার শরীরের পুষ্টিহীনতাকে নির্দেশ করে। অপরদিকে অতিরিক্ত ভারী হওয়ার ফলে আপনার ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই যদি আপনার অতিরিক্ত ওজন থাকে অথবা মোটা হন, তাহলে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।

নিয়ন্ত্রিত বা পর্যাপ্ত ওজনের গর্ভবতী মা তার আগত সন্তানের জন্য ভালো। যে সব নারীদের গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্যকর ওজন থাকে, তারা সহজেই গর্ভধারণ করতে পারে এবং মারাত্মক জটিলতা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্ররোগ গর্ভধারণের সময় হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

অভ্যাস পরিবর্তন করুন

আপনি হয়তো এ সময়টিতে আইসক্রিম এবং আচার খাওয়ার ইচ্ছে করবেন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্বাস্থ্যকর সকল খাদ্যের দিকে মনোনিবেশ করুন। গর্ভাবস্থায় আপনার প্রচুর প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন হবে। তাই ফল, বাদাম, শাক শাকসবজির পাশাপাশি কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারগুলো গ্রহণ করুন। অন্যদিকে চিপস, অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় এবং জাঙ্ক কিংবা ফাস্টফুড পরিহার করুন।

পশ্চিমা সংস্কৃতির মত আমাদের দেশেও অনেক নারীকে সিগারেট বা মদ জাতীয় পানীয় গ্রহণ করতে দেখা যায়। এসব ক্ষতিকারক দ্রব্য আপনার জন্ম না নেয়া বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। তাই যথা সম্ভব ধুমপানসহ অন্যান্য বাজে অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।

যে সব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে:

  • অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়
  • প্যাকেটজাতকরণ খাবার
  • খুব বেশি পরিমাণে চা বা কফি
  • ক্যাফিন
  • ধোয়া নয় এমন ফলমূল
  • ধুমপান

কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

আপনার কর্মক্ষেত্র নিরাপদ কিনা নিশ্চিত হোন। বেশীর ভাগ কর্মক্ষেত্র গর্ভাবস্থায় নিরাপদ। কিন্তু কিছু মানুষ বিশেষ কিছু বস্তু বা যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করে যা জন্ম না নেয়া বাচ্চার ভ্রুণের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে।

পরিবারের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানুন

আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য ইতিহাস নিয়ে আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। যদি আপনি অথবা আপনার স্বামীর জিনগত রোগ যেমন সিষ্টিক ফাইব্রোসিস অথবা থ্যালাসেমিয়ার মত পারিবারিক ব্যাধী থাকে, তাহলে আপনি এ সম্পর্কে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।


►► আরো দেখো: জন্মের প্রথম ঘণ্টা থেকেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো
►► আরো দেখো: সিজারের পরে সহবাস কিভাবে করবেন? ভুল করছেন না তো?


শেষ কথা

গর্ভধারণের কেবল ১০ মাসই নয়, মাতৃত্বের গোটা পথটাই বড্ড চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। মা তো কেবল নিছকই একটা ডাক বা অনুভূতি নয়! মাতৃত্ব পৃথিবীর সেরা অনুভূতিগুলোর একটি। তাই গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রিয় সন্তানটির পৃথিবীতে আসা পর্যন্ত একজন মা হিসেবে আপনার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তাই শুরুটা শুরু করুন স্বাস্থ্যকর উপায়ে। গর্ভাবস্থার এই সময়টা শুধুমাত্র শারীরিকভাবেই না, মানসিক দিক থেকেও এগিয়ে থাকার চেষ্টা করুন।

Photo by Pixabay on Pexels

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *