পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ ২০২২ (যোগ্যতা, পরীক্ষা, বেতন)

বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান এই দেশের একটি সম্মান এবং গৌরবের জায়গা। তাই প্রতি বছরের মত এই বছরও পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ ২০২২ কে ঘিরে রয়েছে চাকুরী প্রার্থীদের অনেক আগ্রহ এবং আকাঙ্ক্ষা। আজকে আমরা আলোচনা করবো পুলিশ কন্সটেবল নিয়োগে যোগ্যতা, বয়স, নিয়োগ পদ্ধতি, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে।

তবে তার আগে জেনে নেয়া যাক, বাংলাদেশ পুলিশের পদমর্যাদার ক্রম বিন্যাস। পদমর্যাদার মধ্যে সবচেয়ে প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে কন্সটেবল এবং সর্বোচ্চ ধাপ হলো আইজিপি। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হচ্ছেন র‍্যাব এর সাবেক মহাপরিচালক ড. বেনজির আহমেদ। আইজিপি নিযুক্ত হন ৪ বছরের জন্য এবং তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করতে পারেন।

নিচে বাংলাদেশ পুলিশের পদমর্যাদার ক্রমবিন্যাস দেখানো হলো:

  • কন্সটেবল
  • নায়েক
  • এএসআই
  • সার্জেন্ট
  • এসআই
  • ইন্সপেক্টর
  • এএসপি
  • সিনিয়র এএসপি
  • এডিশনাল এসপি
  • এসপি
  • এডিশনাল ডিআইজি
  • ডিআইজি
  • এডিশনাল আইজিপি
  • আইজিপি

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ ২০২২

নতুন নিয়মে ১০ হাজার কন্সটেবল নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ সরকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যার আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে এবং আবেদনের শেষ তারিখ ৭ই অক্টোবর বিকাল ৫ টা পর্যন্ত।

গত ৯ই সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি ( রিক্রুটমেন্ট এবং ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ২) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলামের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নিয়োগ ঘোষণা দেয়া হয়।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে যোগ্যতা

পুলিশ কন্সটেবল নিয়োগ ২০২২ এর এই বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রার্থীকে অবশ্যই এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ ২.৫ পেতে হবে এবং অবশ্যই অবিবাহিত হতে হবে। এই ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত/ তালাকপ্রাপ্তা অবিবাহিত হিসেবে গণ্য হবে না। প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।

শারীরিক যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, পুরুষ প্রার্থীর ক্ষেত্রে সাধারণ উচ্চতা অবশ্যই ন্যূনতম ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং কোটাধারীদের ক্ষেত্রে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি হতে হবে। বুকের মাপ সাধারণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৩১ ইঞ্চি এবং সম্প্রসারিত ৩৩ ইঞ্চি, কোটাভুক্ত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০ ইঞ্চি এবং সম্প্রসারিত ৩১ ইঞ্চি হতে হবে।

নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণ উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি এবং কোটাভুক্ত প্রার্থীদের জন্য ৫ ফুট ২ ইঞ্চি হতে হবে। নারী এবং পুরুষ উভয় প্রার্থীর ওজন অবশ্যই তার উচ্চতা এবং বয়স অনুযায়ী অনুমোদিত ওজন হতে হবে। উভয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিসীমা অবশ্যই ৬/৬ হতে হবে।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ বয়স কত

নারী এবং পুরুষ উভয় প্রার্থীর ক্ষেত্রেই বয়স ৭ই অক্টোবর, ২০২১ এর মধ্যে ১৮ থেকে ২০ বছর হতে হবে। তবে যে সকল প্রার্থীর বয়স ২৫ মার্চ ২০২০ তারিখে সর্বোচ্চ বয়সসীমা অর্থাৎ ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে তারাও আবেদন করতে পারবেন।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি

বাংলাদেশ পুলিশে চাকরী পেতে হলে ঘুষ ছাড়া কোন বিকল্প নেই- এই অভিযোগ অনেক পুরোনো, যদিও বর্তমানে এই অভিযোগ অনেকটাই ভিত্তিহীন হয়ে এসেছে। তবুও এই অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি পেতে এইবার কন্সটেবল পদে নিয়োগ হবে সর্বমোট ৭টি ধাপে।

ধাপগুলো হলো প্রাথমিক বাছাই, শারীরিক মাপ এবং ফিজিক্যাল এডুরেন্স টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা, মনস্তাত্বিক এবং মৌখিক পরীক্ষা, প্রাথমিক নির্বাচন, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চূড়ান্ত প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্তকরণ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই ৭ টি ধাপের কোন একটি ধাপে যদি প্রার্থী অকৃতকার্য হয় তাহলে সে কোনভাবেই পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে না। পাশাপাশি কোন ধাপ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রার্থীর কোন প্রকার সুপারিশ কিংবা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। প্রত্যেকটি ধাপের বিস্তারিত বিবরণ নিন্মে দেয়া হল।

১. প্রাথমিক বাছাই

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ ২০২২ এর প্রাথমিক পর্যায়টি অনলাইনে রাখা হয়েছে। প্রার্থী কর্তৃক প্রদত্ত কোন তথ্য যদি মিথ্যা অথবা অসম্পূর্ণ হয় তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার যেকোন সময় তা বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

আগ্রহী প্রার্থীদের ৭ই অক্টোবর বিকাল ৫ টার মধ্যে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন ফর্ম পূরণকরতে হবে। প্রার্থীর প্রাথমিক বাছাই শেষে মোবাইলে একটি ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড দেয়া হবে, যা দিয়ে সাইটে ঢুকে প্রবেশপত্র ডাউনলোড করা যাবে।

২. শারীরিক মাপ এবং ফিজিক্যাল এডুরেন্স টেস্ট

এই পর্যায়ে প্রার্থীকে নির্ধারিত দিনে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত কাগজপত্রসহ পরীক্ষার ভেন্যুতে উপস্থিত হতে হবে। প্রার্থীকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং মাস্ক পরে ভেন্যুতে আসতে হবে। যদি কোন প্রার্থীর শারীরিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী পাওয়া যায় তাহলে তাকে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। এই ধাপটি সর্বমোট তিনদিনে বিভক্ত।

  • প্রথম দিনে প্রার্থীর কাগজপত্র এবং শারীরিক উচ্চতা, মাপ এবং ওজন পরীক্ষা করা হবে।
  • দ্বিতীয় দিনে ৪ টি ফিজিক্যাল এডুরেন্সের ইভেন্ট (২০০ মিটার দৌড়, পুশ আপ, লং জাম্প এবং হাই জাম্প)।
  • তৃতীয় দিনে ৩ টি ফিজিক্যাল এডুরেন্স ইভেন্ট (১৬০০ মিটার দৌড়, ড্র্যাগিং এবং রোপ ক্লাইম্বিং) অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থী যদি কোন একটি ধাপে অকৃতকার্য হয় তাহলে সে পরবর্তী ধাপের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

২য় দিনের ৪ টি ইভেন্ট

  • ২০০ মিটার দৌড়: এই ইভেন্টে পুরুষ প্রার্থীদের ২৮ সেকেন্ডে ২০০ মিটার এবং নারী প্রার্থীদের ৩৮ সেকেন্ডে ২০০ মিটার অতিক্রম করতে হবে।
  • পুশআপ: এই ইভেন্টে পুরুষ প্রার্থীদের ৩৫ সেকেন্ডে ১৫ টি এবং নারী প্রার্থীদের ৩০ সেকেন্ডে ১০ টি পুশআপ দিতে হবে।
  • লং জাম্প: এই ইভেন্টে পুরুষদেরকে লং জাম্প দিয়ে কমপক্ষে ১০ ফুট এবং নারীদেরকে কমপক্ষে ৬ ফুট দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে। এই ইভেন্টে আপনি সর্বোচ্চ তিনবার সুযোগ পাবেন।
  • হাই জাম্প: এই ইভেন্টে পুরুষ প্রার্থীদের কে কমপক্ষে ৩.৫ ফুট এবং নারী প্রার্থীদেরকে কমপক্ষে ২.৫ ফুট উচ্চতা অতিক্রম করতে হবে। এই ধাপেও আপনি সর্বোচ্চ তিনবার সুযোগ পাবেন।

তৃতীয় দিনের ৩টি ইভেন্ট

  • ১৬০০ মিটার দৌড়: এই ইভেন্টে পুরুষ প্রার্থীদেরকে ৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ১৬০০ মিটার দুরত্ব এবং নারীদেরকে ৬ মিনিটে ১০০০ মিটার দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে।
  • ড্র্যাগিং: এই পর্যায়ে পুরুষ প্রার্থীদেরকে ১৫০ পাউন্ড ওজনের টায়ার ৩০ ফুট পর্যন্ত এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১১০ পাউন্ড ওজনের টায়ার টেনে ২০ ফুট পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
  • রোপ ক্লাইম্বিং: এই পর্যায়ে পুরুষ প্রার্থীদের কমপক্ষে ১২ ফুট এবং নারী প্রার্থীদের কমপক্ষে ৮ ফুট পর্যন্ত দড়ি বেয়ে উঠতে হবে।

এই পুরো ধাপটি কেমন হতে পারে তার একটি প্রস্তুতিমূলক ভিডিও বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট, ভেরিফাইড ফেইসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলেও দেয়া আছে।

৩. লিখিত পরীক্ষা

মোট ৪৫ নম্বরের এই লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীকে বাংলা, ইংরেজী, গণিত এবং সাধারণ বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রশ্নের লিখিত উত্তর দিতে হবে।

৪. মৌখিক এবং মনস্তাত্বিক পরীক্ষা

প্রার্থীকে মোট ১৫ নম্বরের এই পরীক্ষায় মৌখিক এবং মনস্তাত্বিক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে হবে।

৫. প্রাথমিক নির্বাচন

বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত প্রতি জেলায় নির্ধারিত প্রার্থী সংখ্যা এবং কোটা ভিত্তিক সংখ্যার উপর ভিত্তি করে লিখিত, মৌখিক এবং মনস্তাত্বিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হবে।

৬. পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা

প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রত্যেক প্রার্থীকে অবশ্যই নিজ নিজ জেলায় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে প্রার্থীরা পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্ম পূরণ করবে।

উল্লেখ্য পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্ম পুরণ করার সময় প্রার্থী কোন মিথ্যা অথবা ভুল তথ্য দিলে পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা হবে না।

৭. চুড়ান্ত প্রশিক্ষণে অন্তুর্ভুক্তিকরণ

এই পর্যায়ে প্রার্থী চুড়ান্তভাবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অনুমদন পাওয়ার পর পুলিশ হেডকোয়াটার্স এর প্রতিনিধি এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি পুনর্বিবেচনা করে প্রার্থীর চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ অনুমোদন করবে।

প্রশিক্ষণ

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ ২০২২ এর নতুন এই নিয়মের ৭ টি ধাপ শেষে প্রার্থীকে ৬ মাস মেয়াদী একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রার্থী সরকারী খরচে থাকা- খাওয়া, পোশাক সামগ্রী এবং সরকারী নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রশিক্ষণ ভাতা পাবেন।

বেতন

সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করার পরে সকল প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১৭ তম গ্রেড অর্থাৎ ৯,০০০ – ২১, ৮০০ টাকা বেতন পাবেন। এছারাও সরকারী বিধি মোতাবেক অন্যান্য সকল ভাতা, রেশন এবং সুযোগ সুবিধাও পাবেন।

অন্যান্য সুবিধা

নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থী সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষে নিজ নিজ জেলায় অংশগ্রহণের দিন থেকে তার শিক্ষানবিশকাল গণনা শুরু হবে। শিক্ষানবীশ হিসেবে অংশগ্রহণের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত সন্তোষজনক চাকুরীকাল অতিক্রম করার পর তাকে কন্সটেবল পদে স্থায়ী ঘোষণা করা হবে। স্থায়ী ঘোষণা হবার আগ পর্যন্ত অবশ্যই প্রার্থীকে অবিবাহিত থাকতে হবে।

এছাড়াও অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে সরকারি খরচে পোশাকসামগ্রী, চিকিৎসা ভাতা, ঝুঁকি ভাতা এবং পরিবারের নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্যের রেশন পদন্নোতি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তি মিশনে যাওয়ার সুযোগ।

►► আরো দেখুন: সাব-ইন্সপেক্টর হতে চাইলে যা করবেন

শেষ কথা

বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন রকম টেস্ট এবং অনলাইন আবেদন করার প্রক্রিয়া এটাই প্রমাণ করে যে পুলিশ কন্সটেবল নিয়োগ ২০২২ হতে যাচ্ছে একটি স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন একটি প্রক্রিয়া। আশা করা যায় এর মাধ্যমে পুলিশে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগ ছিল এতদিন তা চলে যাবে।

২০২০ সালে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড পরিস্থিতির কারণে তা আটকে ছিল। সরকার পুনরায় এই নিয়োগ চালু করে পুলিশ বাহিনীকে আরো যোগ্য করার প্রচেষ্টায় আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। তাই আর দেরি না করে দ্রুত নিজেকে এই নিয়োগ পরীক্ষার জন্য যোগ্য করে তুলুন এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *